পৃষ্ঠাসমূহ

ছোট গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোট গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৫ মে, ২০২৫

অনিশ্চিত জীবনের সব কিছুই যেন এক ধোঁয়াশা

অনিশ্চিত জীবনের সব কিছুই যেন এক ধোঁয়াশা। স্বপ্ন দেখি, ভালোবাসি, হারাই, আবার উঠে দাঁড়াই। তবু শেষে যখন একলা হয়ে যাই, তখন বুঝি সব আয়োজনই ছিল ক্ষণিকের, সব অনুভবই ছিল মিথ্যে এক আশ্বাস। তবু মানুষ আশা করে, কারণ মিথ্যেই অনেক সময় একমাত্র সত্য মনে হয়।




বুধবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৪

প্রিয়, বেশি কিছু চাই না



প্রিয়, বেশি কিছু চাই না

লেখকঃ মুহাম্মদ সালেহ

প্রিয়, বেশি কিছু চাই না, শুধু সারাটি জীবন তোমার মায়াতেই জড়িয়ে থাকতে চাই।
আকাশের নীলের মতো গভীর ভালোবাসা ছিল তামান্না আর রাকিবের। তাদের সম্পর্কটা ছিল অন্যরকম। কোনো বড় প্রতিশ্রুতি, দামি উপহার বা জমকালো রোমান্টিকতা ছিল না। ছিল শুধু একে অপরের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর নির্ভরতা।
তামান্না সহজ-সরল মনের এক মেয়ে। জীবনের চাওয়াগুলো ছিল খুবই সাধারণ। ভালোবাসা তার কাছে ছিল নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে সে সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে শান্তি খুঁজে পেত। রাকিব ছিল তার ঠিক সেই আশ্রয়স্থল। রাকিবের চোখের মায়ায় তামান্না নিজেকে একদম ভুলে যেতে পারত।
তারা যখন একসঙ্গে হাঁটত, তামান্না চুপচাপ শুনত রাকিবের কথা।
রাকিবের প্রতিটা কথা যেন মনের গভীরে পৌঁছে যেত। একদিন রাকিব মজা করে বলেছিল, "তোমার কাছে আমার চেয়ে আকাশ আর তারাগুলো বেশি প্রিয়, তাই না?" তামান্না মিষ্টি হেসে বলেছিল, "প্রিয়, বেশি কিছু চাই না। শুধু সারাটি জীবন তোমার মায়াতেই জড়িয়ে থাকতে চাই। আকাশে তারাদের আলো তো বদলে যায়, কিন্তু তোমার ভালোবাসা কখনো বদলাবে না।"
সেইদিন রাকিব উপলব্ধি করেছিল, তামান্না তার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। তার সরলতা, ভালোবাসার গভীরতা তাকে প্রতিনিয়ত আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে যেত। তাদের দিনগুলো কেটেছিল একে অপরের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতিতে।
কিন্তু জীবনের পথটা তো সবসময় সমতল হয় না। একদিন রাকিবের চাকরিসূত্রে তাকে অন্য শহরে চলে যেতে হলো। দূরত্ব তাদের জন্য নতুন এক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ালো। তামান্না ভাবত, ভালোবাসা কি দূরত্বে ম্লান হয়ে যাবে? কিন্তু রাকিব প্রতিদিন তামান্নার সঙ্গে কথা বলত, তাকে আশ্বাস দিত, "এই দূরত্ব কখনো আমাদের সম্পর্কের গভীরতা কমাতে পারবে না। আমি জানি, তুমি আমার শক্তি।"
সময় কেটে গেল। দূরত্ব সত্ত্বেও তাদের ভালোবাসা অটুট থাকল। অবশেষে একদিন রাকিব ফিরে এলো, আর তামান্নার হাত ধরে বলল, "তামান্না, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তোমার মায়ার বাঁধনে সারাজীবন জড়িয়ে থাকব। আর কখনো দূরে যাব না।"
তামান্নার চোখ ভিজে উঠল। সে শুধু বলল, "প্রিয়, আমি কখনোই বেশি কিছু চাইনি। শুধু তোমার ভালোবাসার মায়াতেই বেঁচে থাকতে চেয়েছি।"
সেদিন তাদের ভালোবাসার গল্প পূর্ণতা পেল। জীবন যেমনই কঠিন হোক, তাদের সম্পর্ক প্রমাণ করল যে সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো দূরত্ব বা সময়ের কাছে হার মানে না।

সোমবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৪

হঠাৎ হারিয়ে যাবো....

 হঠাৎ হারিয়ে যাবো

লেখকঃ মুহাম্মদ সালেহ



 

অনেক দিন হলো, রাতের নিস্তব্ধতায় মন হারিয়ে যায় অতীতের স্মৃতিগুলোতে। রূপা, ছোটবেলা থেকে এমনই ছিল, আবেগপ্রবণ এবং স্বপ্নময়। সবকিছুতেই যেন এক অন্যরকম রঙ খুঁজে পেত। ক্লাসে সবাই মিলে যখন খেলাধুলায় মেতে উঠতো, রূপা তখন বসে থাকতো মাঠের এক কোনে, আকাশের দিকে তাকিয়ে। ওর কাছে সবকিছু যেন এক অন্যরকম অনুভূতি জাগাতো।

জীবনের প্রতিটি দিনকে রঙিন মনে করতো রূপা। তবে ওর এই জীবনটা হঠাৎই পাল্টে গেলো, যখন ওর বাবা হঠাৎই দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলো। বাবা ছিল ওর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। বাবার হাসি, ওকে নিয়ে সাইকেল চালানো, গল্প বলা সবকিছু যেন এক মুহূর্তে থেমে গেলো।

বাবার মৃত্যুর পর রূপার মনে হলো, ওর ভেতর থেকে কোনো কিছু হারিয়ে গেছে। বন্ধুরা সবাই পাশে ছিল, কিন্তু রূপা নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে ফেললো। মনে হতো যেন, সবকিছুই অর্থহীন হয়ে গেছে। প্রতিদিনের হাসি-মজার ভেতরেও একটা শুন্যতা ওকে গ্রাস করতো।

একদিন হঠাৎ করেই, রূপা সিদ্ধান্ত নিলো যে ও হারিয়ে যাবে। কেউ যেন জানতে না পারে কোথায় গেলো, কী করছে। ওর চেনা জায়গাগুলো থেকে দূরে, একাকী কোনো এক শহরে গিয়ে নিজের মতো করে বাঁচবে। কোনো পরিকল্পনা ছিল না, শুধুই পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে।

অচেনা শহরে পৌঁছে রূপা নতুনভাবে জীবন শুরু করলো। এখানেও কিছু মানুষ ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চেয়েছিল, কিন্তু ও তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতো। নিজের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া একটা ভালো লাগা ছিল ওর। একা থাকার মাঝে একধরনের মুক্তি খুঁজে পেত।

কিন্তু একদিন, এক অন্ধকার রাতে, আকাশের দিকে তাকিয়ে রূপা বুঝলো, ও যেখানেই যাক না কেন, ওর ভেতরের শুন্যতাটা কখনও পূর্ণ হবে না। কিছু হারিয়ে যাওয়ার ব্যথা, ভালোবাসার অভাব, আর প্রিয়জনের স্মৃতি ওকে আজীবন তাড়া করে বেড়াবে।

রূপা হয়তো হারিয়ে গেছে চেনা মানুষের কাছ থেকে, কিন্তু নিজের মন থেকে পালিয়ে যেতে পারেনি।

সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৪

মায়ের চোখের জল....



  মায়ের চোখের জল

লেখকঃ মুহাম্মদ সালেহ

 

রাতের অন্ধকারে ঘরের কোণে বসে কাঁদছিল রমলা। তার একমাত্র ছেলে অর্ণব গতকাল রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে, আর ফিরে আসেনি। অর্ণবের বয়স মাত্র ২২, কিন্তু মায়ের চোখের মণি। একমাত্র ছেলেকে ঘিরেই তার সব স্বপ্ন ছিল। ছোটবেলা থেকেই অর্ণব ছিল খুব চঞ্চল, কিন্তু পড়াশোনায় তেমন মনোযোগী ছিল না। রমলা ভেবেছিল, সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু কলেজে ওঠার পর অর্ণবের জীবন বদলে গেল। খারাপ সঙ্গ, নেশার জগৎ, আর রাত জাগার অভ্যাসে জড়িয়ে পড়েছিল সে। রমলা অনেকবার বুঝিয়েছে, বোঝানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না। ছেলেকে নিয়ে তার অগাধ মায়া, কিন্তু একই সঙ্গে ভয়ের অন্ধকারও গ্রাস করছিল।

অর্ণবের বন্ধুরা সবসময়ই ছিল নেশা, মদ, আর মাদকদ্রব্যের সাথে জড়িত। একদিন হঠাৎ করেই রমলা জানতে পারল, অর্ণব পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য রাখার অভিযোগ। সেই মুহূর্তে রমলার পৃথিবী যেন থেমে গেল। আদালতে ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার দিন তার চোখের জল বাঁধ মানল না। কিন্তু অর্ণব সেদিন মায়ের দিকে একবারও ফিরে তাকায়নি।

কয়েক মাস পর, একদিন হঠাৎ অর্ণব ফিরে এলো। সে ছিল মলিন, ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত। রমলা কিছু না বলে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিল। অর্ণব কিছুক্ষণ নিশ্চুপ ছিল, তারপর মায়ের চোখের জল দেখে বলল, "মা, আমি সব বুঝেছি। আমি তোমার জীবনটাকে নরক বানিয়ে দিয়েছি, কিন্তু এবার আমি সত্যি বদলাতে চাই।"

রমলার চোখে আনন্দের অশ্রু জড়িয়ে এলো। সে জানত না অর্ণব সত্যিই বদলাবে কি না, কিন্তু এই কথাগুলো তার মনের মধ্যে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দিল। সে তার ছেলেকে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিল।

অর্ণব সত্যিই বদলানোর চেষ্টা করছিল। সে তার পুরোনো জীবন ছেড়ে দিতে শুরু করল, ধীরে ধীরে মাদক থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছিল। রমলা তার পাশে ছিল সবসময়, তার মায়ের ভালোবাসা আর মনের জোরই ছিল অর্ণবের মূল শক্তি।

কিন্তু হঠাৎ একদিন অর্ণব আবারও পুরোনো সঙ্গের কাছে ফিরে গেল। সে আর পেরে উঠছিল না। রমলার হৃদয়টা ভেঙে গিয়েছিল সেই মুহূর্তে। তার চোখের জল যেন শুকিয়ে গিয়েছিল, শুধু নিঃশব্দে তার বুকের ভেতর কান্না জমে ছিল।

এরপর একদিন, ভোরবেলা রমলার ফোন বেজে উঠল। অর্ণব আর নেই – নেশার অতিরিক্ত মাত্রায় তার জীবন শেষ হয়ে গেছে। রমলার মনে হলো, তার জীবনের শেষ আশাটুকুও হারিয়ে গেল।

অর্ণবের শবযাত্রার সময়, রমলার চোখে আর কোনো অশ্রু ছিল না। তার চোখের জল সব শেষ হয়ে গিয়েছিল আগেই। কিন্তু হৃদয়ের গভীরে এক অদৃশ্য কান্না ছিল, যা কোনোদিনই থামবে না। এই কান্না সেই মায়ের, যে তার সন্তানের জন্য জীবন দিয়ে ভালোবাসা, আর শেষ পর্যন্ত সেই ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে হারানোর বেদনা পেয়েছিল।

"মায়ের চোখের জল" শুধু অর্ণবের গল্প নয়, বরং প্রতিটি সেই মায়ের গল্প, যারা নিজেদের সন্তানদের ভুলের ভার বয়ে বেড়ায়, আর তাদের চোখের জল হয়ে যায় অন্তহীন বেদনার প্রতীক।

শনিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৪

বেকারের বৃত্তান্ত....

 

বেকারের বৃত্তান্ত

লেখকঃ মুহাম্মদ সালেহ

 

রাহুলের জীবনটা যেন থমকে আছে। চারপাশের সবাই তাকে নিয়ে কথা বলে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন। তারা কেউ কেউ করুণা করে, আবার কেউ বিদ্রুপ করে। "ছেলেটা এখনো কিছু করতে পারল না!" এই কথাটা শুনতে শুনতে রাহুলের মনের ভিতরটা যেন শূন্য হয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো রেজাল্ট নিয়ে বের হলেও চাকরি জোটেনি। প্রতিদিন নতুন নতুন চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করে, ইন্টারভিউ দেয়, কিন্তু কোথাও যেন কপাল খুলছে না। রাহুলের বাবা-মা শুরুতে তাকে অনেক সান্ত্বনা দিতেন, কিন্তু তাদের ধৈর্যের বাঁধও ভেঙে গেছে। এখন তার বাবার মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। মা শুধু নীরবে তাকিয়ে থাকেন। কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারেন না, কারণ তার চোখের জল অনেক কিছুই বলে দেয়।

বেকার জীবনের দিনগুলো দীর্ঘ। সময়ের মূল্য যেন দিনকে দিন কমে আসছে। রাহুল তার পুরোনো বন্ধুদের সাথে তেমন যোগাযোগ রাখে না। কারণ, তারা কেউ এখনো বেকার নেই। কেউ ব্যবসা শুরু করেছে, কেউ বড় চাকরিতে ঢুকেছে। রাহুলের মনে হয়, সে যেন সবাই থেকে পিছিয়ে পড়েছে।

রাতে ছাদে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে রাহুল ভাবতে থাকে এই জীবনটা কি শুধু অপেক্ষার? কোথায় তার সেই স্বপ্ন, যেগুলো নিয়ে একসময় সে ভবিষ্যতের ছবি আঁকত? তার মনে হয়, সমাজ তাকে চাপে ফেলে দিচ্ছে, কিন্তু সে সেই চাপ থেকে বের হতে পারছে না।

একদিন রাহুলের পুরোনো এক বন্ধু অমিত হঠাৎ দেখা করতে আসে। অমিত এখন সফল উদ্যোক্তা। ছোট ব্যবসা শুরু করে আজ সে একটা বড় প্রতিষ্ঠানের মালিক। রাহুলের সাথে আড্ডার এক পর্যায়ে অমিত বলে, "দোস্ত, বেকারত্ব মানেই তো শেষ না। আমি তো কোনো চাকরি পাইনি, তাই নিজেই একটা কিছু শুরু করেছি। ছোট হলেও চেষ্টা কর।"

অমিতের কথা রাহুলের মনে দাগ কাটে। তার ভিতরটা কাঁপতে থাকে সে কি পারে না নিজের জন্য কিছু করতে? হোক সেটা ছোট, তবুও একটা কিছু।

রাহুল রাতের অন্ধকারে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পায়। সে ঠিক করে, আর বসে থাকবে না। একটা ছোট উদ্যোগ নিয়েই শুরু করবে। হয়তো প্রথমে সফল হবে না, কিন্তু চেষ্টা করতে হবে।

সে একটা ডায়েরি খুলে লক্ষ্য ঠিক করে—কী কী করতে হবে, কীভাবে শুরু করতে হবে। পরিবারকে জানালে শুরুতে তারা অবাক হয়, কিন্তু পরে সমর্থন দেয়। রাহুল জানে, সমাজের কাছে সে হয়তো আজ বেকার, কিন্তু সে নিজের কাছে একজন লড়াই করা যোদ্ধা।

"বেকারত্ব" আসলে কোনো অভিশাপ নয়, এটা হতে পারে নতুন কিছু শুরু করার সুযোগ। রাহুল সেই সুযোগটা নিয়েই নতুন পথে পা বাড়ায় নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়ার পথে।

বুধবার, ২ অক্টোবর, ২০২৪

অপ্রকাশিত অনুভূতি

 



অপ্রকাশিত অনুভূতি

লেখকঃ মুহাম্মদ সালেহ

 

তৃষা ও অরুণ একে অপরকে ছোটবেলা থেকেই চিনত। একই পাড়ায় বড় হওয়া, একই স্কুল, একই খেলার মাঠ তাদের জীবনের প্রতিটি ধাপে যেন এক অদৃশ্য বাঁধন ছিল। তৃষা সবসময়ই অরুণকে বন্ধু হিসেবেই দেখেছে, কিন্তু অরুণের মনের গোপন কোণে অনেক দিন থেকেই ছিল অন্য এক অনুভূতি ভালবাসা।

অরুণ কখনও তৃষাকে কিছু বলতে পারেনি। তৃষার প্রতি তার ভালবাসা এতটাই গভীর ছিল যে সে ভয় পেত, যদি বলার পর তাদের বন্ধুত্বে কোনো ছেদ পড়ে। তৃষার হাসি, তার কষ্ট, তার প্রতিটি ছোট ছোট ইচ্ছা সবকিছুই অরুণের মন ছুঁয়ে যেত, কিন্তু সে শুধু নীরবে তাকিয়ে থাকত।

তৃষা ছিল স্বপ্নময়, হাসিখুশি একটা মেয়ে। তার জীবনের গল্পে ছিল রঙিন পাতা, নতুন নতুন সম্ভাবনা। সে কখনও অরুণের মনের গভীরের সেই অপ্রকাশিত অনুভূতিকে বুঝতে পারেনি। অরুণও চেষ্টা করেনি তার মনের কথা তৃষাকে জানাতে।

কিন্তু একদিন তৃষা অরুণকে জানাল, সে দেশের বাইরে পড়তে যাবে। অরুণের হৃদয়ে যেন ঝড় বয়ে গেল। তার মনে হলো, এই মুহূর্তে যদি সে কিছু না বলে, তবে হয়তো আর কোনোদিন বলতে পারবে না। কিন্তু তৃষার উচ্ছ্বাস আর স্বপ্নের মাঝে তার মনের কথা বলার সাহস পেল না অরুণ। সে শুধু হাসিমুখে বলল, "তুই ভাল থাকিস, তৃষা। তুই যা চাইছিস, তা যেন সব পাস।"

তৃষা চলে গেল বিদেশে পড়তে। সময় বয়ে চলল, তৃষার জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হলো। দূরত্ব তাদের মধ্যে যোগাযোগের ফাঁক তৈরি করল। অরুণ বুঝতে পারল, তার সেই অপ্রকাশিত অনুভূতির জন্য আজীবন তাকে একা থাকতে হবে।

একদিন তৃষা দেশে ফিরল, কিন্তু সে তখন অন্য কারও সঙ্গে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে প্রস্তুত। অরুণ তাদের জন্য শুভকামনা জানাল। তৃষার চোখে আনন্দ আর ভালোবাসার ঝিলিক দেখে অরুণের মনে হল, সে যা করতে পারেনি, সেটাই তৃষার জীবনের আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অরুণের মনের সেই অনুভূতি, যে অনুভূতি সে এতদিন ধরে নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল, তা আজও অপ্রকাশিত রয়ে গেল। তৃষার জীবনের পথে সে এক নিঃশব্দ পথিক হয়ে থেকে গেল, আর তার হৃদয়ের সেই অপ্রকাশিত ভালবাসা ধীরে ধীরে অতীতের পাতায় মিশে গেল।

অরুণ জানে, সে হয়তো তৃষাকে তার মনের কথা কোনোদিনও বলতে পারবে না। কিন্তু তার এই অপ্রকাশিত অনুভূতিই তার জীবনের একমাত্র সত্যি, যা সে নীরবেই বয়ে বেড়াবে।

রবিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

অপেক্ষার শেষ প্রহর



নীলার জীবনের একমাত্র অবলম্বন ছিল তার ছোট ভাই শুভ। বাবা-মাকে হারানোর পর থেকে, দুই ভাইবোনই একে অপরের জন্য সবকিছু। নীলা সব সময় শুভর যত্ন নিয়েছে, তার ছোটবেলার প্রতিটি মুহূর্তকে আনন্দে ভরিয়ে রেখেছে। শুভর পড়াশোনা, ছোট ছোট স্বপ্ন, সবই ছিল নীলার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়।

কিন্তু জীবন সবসময় যেরকম মসৃণ হয় না, তাদের জীবনেও একদিন তীব্র ঝড় এলো। শুভ একদিন প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ল। নীলা ভয়ে বুক কাঁপতে লাগল। হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা শুভর মুখটা তার চোখের সামনে থেকে সরছিল না। ডাক্তাররা বললেন, পরিস্থিতি খুবই জটিল। শুভকে সুস্থ করতে হলে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে।

কিন্তু নীলার সেই অর্থ নেই। হাতে ছিল শুধু শুভকে বাঁচানোর অদম্য ইচ্ছা। দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে যা যা করতে পারে, সব করেছে সে। ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছে, পরিচিতদের কাছে সাহায্য চেয়েছে, এমনকি তার নিজের গয়না পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে।

সবকিছু ঠিক হয়ে গেলে শুভকে নিয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হলো। কিন্তু যাওয়ার আগের দিন রাতে শুভর শরীরের অবস্থার অবনতি ঘটে। নীলা হাসপাতালের বারান্দায় বসে ছিল, চোখে পানি। রাত গভীর হলেও নীলা অপেক্ষা করে চলেছে ডাক্তারের একটি সুসংবাদের জন্য।

নীলার মনে তখন নানা প্রশ্ন, “শুভ কি বাঁচবে? আমি কি সময় মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারব?” তার মন বারবার ভেঙে পড়ছে, কিন্তু আবার সে নিজেকে সাহস দিয়ে বলে, আমাকে অপেক্ষা করতে হবে, শুভ ফিরে আসবেই।

সময় যেন থেমে গিয়েছে। রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে। হাসপাতালের নিস্তব্ধতা আর নিঃশব্দ কান্না মিলেমিশে এক ভয়ংকর পরিবেশ তৈরি করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ডাক্তার কক্ষে ঢুকলেন। নীলা চোখ মুছে ডাক্তারের দিকে তাকাল। ডাক্তার ধীরে ধীরে বললেন, শুভ আর নেই।

নীলার পৃথিবী যেন থেমে গেল। বুকের ভেতরে সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এতদিনের অপেক্ষার শেষ প্রহর এসে শেষ হলো, কিন্তু সেই অপেক্ষা সুখের নয়, ছিল বিষাদের।

নীলার বুকের মধ্যে ঝড় উঠল, কিন্তু বাইরে সে স্থির। শুভর নিথর দেহের পাশে বসে নীলা শুধু তাকিয়ে থাকল। তার ছোট ভাই, যার জন্য সে এতকিছু করেছে, যে ছিল তার জীবনের একমাত্র আলো, সেই আলো এবার চিরতরে নিভে গেল।

সেই রাতের পর নীলা আর কোনোদিন অপেক্ষা করেনি………

শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

একাকিত্বে হারিয়ে যাওয়া..

 

তাহমিদ ছোটবেলায় ছিল একদম অন্যরকম। তার হাসিখুশি স্বভাব, সবার সাথে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা তাকে সবাই থেকে আলাদা করেছিল। স্কুলের মাঠে বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলে দিন কাটতো, আড্ডার ঝড়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত কখন সময় চলে যেত টেরই পাওয়া যেত না। তবে জীবনের পথে একসময় সেই হাসিখুশি তাহমিদ হারিয়ে গেল।

সময়ের স্রোতে সে আজ একা হয়ে গেছে। বাবা-মা অনেক আগেই চলে গেছেন। বন্ধুরা এখন যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। শহরের ব্যস্ততা, চাকরির চাপে সবকিছুতেই সে একসময় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিল। এখন, যখন একটু অবসর পেয়েছে, তখন দেখলো তার জীবনে আর কিছুই নেই। বড় ফ্ল্যাটের চার দেওয়াল আর নিঃসঙ্গতার প্রাচীর তার একমাত্র সঙ্গী।

একটা সময় ছিল যখন তাহমিদ নিজেকে ভরসা করতো। এখন সেই ভরসাটাও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। দিনের পর দিন সে ঘরে বসে থাকে, টিভির পর্দায় চোখ রাখলেও সেখানে কিছুই দেখে না। চারপাশে শব্দ থাকলেও তাহমিদের মনে যেন এক নিঃশব্দ কোলাহল। একাকিত্ব তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সে যেন নিজেই নিজের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে।

বেশ কয়েকদিন ধরে তাহমিদের শরীর ভালো নেই। কোনো রকমে চা বানিয়ে খেতে গিয়ে চায়ের কাপ হাত থেকে পড়ে যায়। শূন্য চোখে সে চায়ের কাপে তাকিয়ে থাকে, যেন তার নিজের জীবনটাও ঠিক এই চায়ের কাপের মতোভেঙে গেছে, আর জোড়া লাগার সম্ভাবনা নেই।

এক সন্ধ্যায় তাহমিদ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরের রাস্তা আলোতে ঝলমল করছে, লোকজনের কোলাহল, গাড়ির হর্ন, সবকিছু চলছে নিজের নিয়মে। কিন্তু তাহমিদের জীবনে কোনো আলো নেই। হঠাৎ তার মনে হলো, এই পৃথিবীতে সে যেন একদম অপ্রয়োজনীয়। ক’জনই বা তার খোঁজ নেয়? কে তার একাকিত্বের কথা জানে?

তাহমিদ ফিসফিসিয়ে বলে, “মানুষের জীবনে এত একাকিত্ব কেন? এত কষ্ট কেন?” তার গলা কাঁপে, চোখে অশ্রু জমে ওঠে। “আমার মতো কেউ কি আছে? কেউ কি একাকিত্বে এতটা হারিয়ে গেছে?”

এরপর, তার ফোনের স্ক্রিনে একটিমাত্র নোটিফিকেশন আসে। পুরনো এক বন্ধু মেসেজ করেছে, অনেকদিন পর খোঁজ নিয়েছে। তাহমিদের চোখ ভিজে যায়। তার বুকের ভেতর যেন কোনো এক শূন্যতা একটু একটু করে পূর্ণ হতে থাকে। সে বুঝতে পারে, একাকিত্বে হারিয়ে গেলেও, কেউ না কেউ হয়তো আছে, যে তাকে মনে রাখে।


"একাকিত্ব আমাদের জীবনের এমন এক সঙ্গী, যা কখনো আমাদের ছেড়ে যায় না। আমরা যতই চিৎকার করি, সেটা কোনো কানে পৌঁছায় না। তবে কখনো কখনো, একটিমাত্র ভালোবাসার কথা, আমাদের ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগাতে পারে।"

গল্পের মূল বার্তা হলো একাকিত্ব জীবনের একটি কঠিন বাস্তবতা, কিন্তু একটি সাধারণ সহানুভূতির কথাও সেই একাকিত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে।

মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

দুই দিনের মুসাফির...

 

রাতের অন্ধকারে গ্রামের সেই ছোট্ট বাড়িটি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। চারিদিকে যেন এক অসীম নীরবতা। আবু হোসেন, বয়স প্রায় পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই, মাটির বিছানায় শুয়ে আছেন। এক হাতে তার মুঠো করা পুরনো তসবিহ, অন্য হাতে একটা ছোট্ট পুঁটলি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার মনে হচ্ছে, এই দুনিয়ায় তিনি যেন একজন মুসাফিরদুই দিনের অতিথি মাত্র।

তার চোখে হাজারো স্মৃতি। তিনি ছোটবেলায় বাবা-মায়ের হাত ধরে মাঠে দৌড়াতেন, স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে নদীর পাড়ে হেসে-খেলে সময় কাটাতেন। সবকিছুই যেন কালকের মতো মনে হয়, অথচ এখন সময় তাকে আর সেই সুখের জায়গায় ফিরতে দিচ্ছে না। সময়, সেই নিষ্ঠুর সময় সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। স্ত্রী দীর্ঘদিন আগেই তাকে ছেড়ে চলে গেছেন, সন্তানরা শহরের ব্যস্ততায় আটকে পড়েছে। এখন শুধু তিনি আর তার নীরবতা।

মৃত্যু তার দরজায় কড়া নাড়ছে। আবু হোসেন জীবনের এই যাত্রাকে মনে করছেন যেন দুই দিনের মুসাফিরের মতো, কিছুক্ষণের অতিথি। তার একাকীত্বের মধ্যে একটা কথা বারবার মনে আসে, জীবনটা কতই না ক্ষণস্থায়ী, যার শুরু আছে, তার শেষও আছে।

তসবিহের মুঠি টেনে তিনি আল্লাহর নাম স্মরণ করছেন। তার মনে গভীর প্রশ্নযদি পৃথিবী এতটাই ক্ষণস্থায়ী হয়, তাহলে এত কষ্ট কেন? এত ব্যথা কেন? তিনি চোখ বন্ধ করে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করেন, “হে পরওয়ারদিগার, এই যাত্রা যেন শান্তিতে শেষ হয়।

এদিকে তার বড় ছেলে শহর থেকে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে জীবনের শেষ মুহূর্তে দেখে তার বুকের ভেতর শূন্যতা যেন আরও বড় হয়ে উঠছে। সে বাবার শীর্ণ হাতটি ধরে ফিসফিসিয়ে বলে, “বাবা, ক্ষমা করো। আমরা তোমার যত্ন নিতে পারিনি।

আবু হোসেন একটু হাসেন, তারপর কাঁপা কণ্ঠে বলেন, “বাবা, জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। আমরা সবাই মুসাফির। কেউ আগে চলে যায়, কেউ পরে। আজ তোমার বাবা যাচ্ছে, কাল তোমাদের যেতে হবে। তবে মনে রেখো, যে ভালো কাজ করে যায়, সে আল্লাহর কাছে শান্তি পায়।

ছেলের চোখে অশ্রু ঝরে। কিন্তু আবু হোসেনের চোখে যেন এক অপার্থিব শান্তি। ধীরে ধীরে তিনি নিঃশ্বাস ছাড়েন, আর আল্লাহর পথে নিজের যাত্রা শুরু করেন।

শেষ পর্যন্ত, জীবনও যেন একটি সফর। এই দুনিয়ায় আমরা সবাই মুসাফির। কেউ আগে যায়, কেউ পরে। তবে আমাদের কাজই বেঁচে থাকে, সেই কাজই আমাদের পরকাল ঠিক করে দেয়।


"জীবনটা কতই না ক্ষণস্থায়ী, আমরা সবাই দুদিনের মুসাফির মাত্র। যার শুরু আছে, তার শেষও আছে। তবে, ভালো কাজ ছাড়া কেউ বেঁচে থাকে না। সত্যি কেউ বেঁচে থাকে না......।"

অনিশ্চিত জীবনের সব কিছুই যেন এক ধোঁয়াশা

অনিশ্চিত জীবনের সব কিছুই যেন এক ধোঁয়াশা। স্বপ্ন দেখি, ভালোবাসি, হারাই, আবার উঠে দাঁড়াই। তবু শেষে যখন একলা হয়ে যাই, তখন বুঝি সব আয়োজনই ছিল ...